দূর দূর থেকে তুষারপাতের খবর আসছে। অন্য শহর, অন্য দেশ। এ শহর সবে সোয়েটার বার করেছে, তাতে এখনও ন্যাপথলিনের গন্ধ। চাতকের মত মজলিশকামী নাগরিক এই সময়টুকুর প্রত্যাশা করে, তবু আজ সন্ধ্যেটা ঝিমোচ্ছে।

শহরে পা দিয়েই একটা অশনি গন্ধ পেল মহুল। ছটার শো এর পর হাতে চাউমিনের প্যাকেট নিয়ে ঘরে ঢুকেই সকলের থমথমে মুখ আর চাপা আবহাওয়া দেখে বাড়িতে দুঃসংবাদ এসেছে কোনো সেটা আন্দাজ করে যে “এইরে” ব্যাপারটা আসে, সেরকম। একটা চোখ চাওয়া চাওয়ি, “দুলকাই এসেছে কেন? তাহলে কি ন’দাদু ফুড়ুৎ?” এই জাতীয় ভাবনা, সিনেমোত্তর ফুরফুরে মেজাজটা ঢেকেঢুকে চেহারায় একটা “ঈশ, ভেবেই তো…” আবরণ আনার চেষ্টা, ঘরভর্তি গম্ভীর বয়স্কদের ‘ট্রেসপাসারস উইল বি প্রসিকিউটেড’ দৃষ্টি এড়িয়ে ডিম্পির কানে “কেস টা কী” ফিসফিসানো অবধি যে অস্বস্তি টা থাকে, সেই ধাঁচের-ই একটা অম্বল হচ্ছে তার। বাস ট্রাম হাতে গোনা, কতিপয় দোকানের ঝাঁপ এখনও খোলা, এদিকে সবে সাড়ে পাঁচটা। এ শহরকে শুনশান হতে কেউ দেখেনি কখনও, তাই বড় অচেনা লাগে। কার্ফু? জরুরী অবস্থা? হলে ইরাবতী জানাতো না? স্টেশন থেকে বাড়ি ফিরতে না দিয়েই রানীকুঠির মোড়ে জরুরী তলব করত?

পায়ের কাছে রূপোর কাঠি, শিয়রে সোনার। কেউ উলটে দিয়েছে? “দাদা, বনধ নাকি?” একটা অশ্রাব্য কিছু শুনে ফেলেছে এমন ভাব করে প্রায় দৌড় দিল স্টেশনের বাইরে বাস গুমটির লোকটা। হতভম্ব মহুল ট্যাক্সি থামাল একটা। শহর জোড়া নৈস্তব্ধের মধ্যে সন্ধ্যের আজানটা বড় বিষাদময় ঠেকে। ভূতুড়ে গল্পের পটভূমির মত মায়াবী লাগে শহরটাকে। এসব গল্পে ট্যাক্সিচালকটাই আকছার কঙ্কাল হয়ে দেখা দেয়, আর যাত্রী হুঁশ হারায়। পিছনের সিট থেকে চালকের মুখ ঠাহর করার চেষ্টা করে মহুল। কী হল টা কী শহরের?

ট্যাক্সিওলাটাও কেমন তাড়াহুড়ো করে পাঁচশোর নোটটা ভাঙিয়েই চম্পট দিল, একটুও টালবাহানা না করে। টেলিফোন আপিসের সামনের বেঞ্চিটায় ইরাবতী বসে। মহুল বিস্মিত হল। এক, ইরাবতী দেরি তো করেইনি, সময়ের আগে এসেছে বরং, দুই, ও একা নয়। তিন, রোলের দোকানটা খোলেনি। ইরাবতী আর দরজার খিল এর মত রোগা মেয়েটা উঠে দাঁড়াল, খিলের মধ্যে একটু আড়ষ্টতা।

” এই হচ্ছে শ্রুতি, তোকে বলি না… ?”

বলে নি। ডাহা মিথ্যে।

” হ্যাঁ! তোমার কথা অনেক শুনেছি। ” মহুল কেঠো হেসে বলে।

“তোকে একটা উপকার করে দিতে হবে…”

ঘাড় বেঁকিয়ে আবদার করে ইরাবতী। ঢোঁক গেলে মহুল। ইরাবতী কে খুব বেশীদিন চেনে না সে, তার চটন্ত রূপ সম্বন্ধে বেশী তথ্য নেই, ঝুঁকি নেওয়া যাবে না।

“হ্যাঁ! নিশ্চয়!”

শের শাহের সমাজ ব্যবস্থা থেকে কাহিনী শুরু হল, একটা ছোট্ট ঝগড়া হয়ে গেল মেসি ভালো না রোনাল্ডো তাই নিয়ে, সারমর্ম দাঁড়াল এই যে খিলের উপর তার প্রেমিক ছিটকিনি তুলে দিয়েছে। ফোন সমেত সকল প্রকার যোগাযোগ বন্ধ। এদিকে তার জন্মদিন আসীন, ছেলেটির সন্দেহ উদ্রেক না করেই খিল তাকে স্বপাক কেক পাঠাতে চায়, অথচ ছিটকিনির ধুরন্ধর মা বাবার চোখে পড়ার ভয়ে দরজার বাইরে রেখে কেটে পড়লেই হবে না, তাদের দেখবার আগেই ছিটকিনির দেখা চাই, অতএব ছিটকিনি বাড়িতে একা কখন থাকবে সেটা জানা প্রয়োজন। ধরে নিতে আপত্তি নেই সকাল বেলা তালা আপিস এবং চাবি ইস্কুলে পড়াতে যান, তখন কী ছিটকিনি কলেজ কামাই করবে? জন্মদিনের দিন? মহুল যদি সেটা ফোন করে একটু জেনে দেয়।

শহর শুনশান। তাই “আর কাউকে পেলি না” এর উত্তর টা জানা। ব্যাজার মুখে মহুল ফোন বার করে। খিল আঁতকে ওঠে। ” নিজের ফোন থেকে নয়! ও জ্বালাবে নইলে পরে!” জ্বলন্ত চোখে ইরাবতীর দিকে তাকায় মহুল। আজকের পরিত্যক্তপ্রায় শহরে অবলুপ্তপ্রায় সম্পদটি খুঁজে বের করা কঠিন হবে। রানীকুঠি মোড়ের মানচিত্র মাথায় আঁকতে চেষ্টা করে সে। দ্রুত পায়ে দুটো ছেড়ে তিন নম্বর গলি দিয়ে বাঁদিকে ঢোকে। হলুদ বাল্ব টা জ্বলছে। মাঙ্কি টুপি পড়া ঘোলাটে চোখের বৃদ্ধ গোটা তিনেক নবীন আপদ কে তাঁর সিঁড়ির তলার S.T.D/I.S.D/P.C.O লেখা এক চিলতে ফোন বুথের দিকে অগ্রসর হতে দেখে খাবি খান। “কাজ করে?” জানতে চায় মহুল। ঘাড় নাড়েন বিহ্বল বৃদ্ধ। হাতে নোটস ছেঁড়া কাগজে দশ নম্বরী সংখ্যা নিয়ে ক্ষুদ্র কাঠ ঘরটায় প্রবেশ করে মহুল, ছিটকিনির নম্বরে বোতাম টেপে। রিং হয়ে যায়। অস্থির ইরাবতী হঠাৎই ঢুকে আসে। ” এত সময় কিসে লাগে?”

শহর টা আর ফাঁকা লাগে না মহুলের। এইটুকুই শহর। এইতো, যেখানে দু’জনের ই পিঠ ঠেকে আছে, আক্ষরিক ভাবেই। কান থেকে রিসিভার সরিয়ে পাশে নামিয়ে রাখে সে। সবটাই চক্রান্ত, মহুলকে এইখানে এনে ফেলার ফন্দি। শহরের সুপ্তির রহস্যটা গৌণ।

“এতসব শব্দে বোঝাতে পারব না ইরা, তাই… ”

শীতকালের সন্ধ্যায় একটা টেলিফোন বুথে ইরাবতীকে প্রথম চুমুটা খায় মহুল।

আর যা কিছু অকিঞ্চিৎকর।

Advertisements