অজ্ঞাত-ইতিহাসের শহরে সন্ধ্যে সাতটা বাজল। টের পেলাম গলি দশেক আগে ফেলে আসা ঠাকুরদাদা ঘড়িটার জলদগম্ভীর ডাকে। এরা এখনও দম দেয়, তোয়াজ করে চলে পিতামহ কে। সে সময়যন্ত্র সময়ের থেকেও প্রাচীন।  কুড়িয়ে পাওয়া চার আনা আর সাত রাজার ধনের জাদুঘর বন্ধ হবার সময় হয়ে এলো। এগিয়ে চলি। শুকনো কী একটা পাতা পোড়ার গন্ধ পাই, তাতে আচ্ছন্ন হবার রসদ মজুদ। এই বুঝি এদের ধূপকাঠি? দেরাজগুলো কে রাতের নগরের বহুতল মনে হয়, তাদের মৌন বাসিন্দাদের ঘুমনোর সময় হল। সেরকম-ই একটা চার মাথার মোড় ঘুরতেই তার মুখোমুখি হলাম। তাদের বলা উচিৎ, আসলে বাকিরা এই গল্পের মুখ্য ভূমিকা নিতে পারল কই? একটা খয়েরি দেওয়ালে নানা আকারের তৈলচিত্র ঝোলানো। প্রত্যেকটিই নারীর প্রতিকৃতি, তবে এটা কেন? সেটা ভেবে বের করতে বেশ ধকল গেছে। এরা প্রত্যেকেই সাধারণ, সুন্দর, তবু সাধারণ। কোনোটাই ওস্তাদের আঁচড় নয়, নয় সেরা। তবু এইটা, এই ছবিটা এর জনকের শ্রেষ্ঠ কীর্তি, হয়ত শেষ আঁকা। ধুলোর স্তর ঝেড়ে নাম পড়বার চেষ্টা করলাম। পারলাম না। নিজের সবটুকু সমর্পণ করে দেওয়া এই রঙের মিশেলটা আরও কিছুতে যেন আলাদা। বই এর মত করে ছবিটাকে পড়ি। এই নারীর রহস্যময় হাসি নেই, লাস্য নেই, দুঃখ নেই, শোক নেই। একটা আকুতি ভরা প্রশ্ন রয়েছে। আরেকটু কাছে এগোই। ফুঁ-এ ধুলো ওড়াই সে জিজ্ঞাসার হদিশ পেতে।

“কই, এলে না তো?”

দূর্গের এক প্রান্তে একটা ছোট্ট ঘর, তাতে একটাই জানালা, তাই দিয়ে আলো আসে বিস্তর। সে জানালা দিয়ে ওই নীচে পরিখাটা দৃশ্যমান, তার ওপারে সবুজ উপত্যকাটা ছুঁচলো হয়ে গিয়ে হঠাৎ খতম হয়ে গিয়েছে, কলমা জানে সেই খাদে কাস্পি সাগর বাস করে। গোটা অট্টালিকাটা নিশ্ছিদ্র কয়েদখানার সামিল তার কাছে, কেবল এই ঘরটিই তার ফিরদৌস। ভারী দরজাখানা ঠেলে রুবায়েৎ ঢোকে। গত আধ সাল ধরে কলমাকে দেখছে সে। আর আঁকছে। সেই ছবির এক কণাও কলমা আজ তক চোখে দেখেনি। কাষ্ঠ হাসি হেসে ইজেলে মোটা কাগজখানা সে দাঁড় করায়, আজ আখরি রোজ। কলমা জানালা থেকে চোখ সরায় না। রুবায়েৎ চলে গেলে এই ঘরটাও তাকে গিলে খাবে, কোথায় যাবে সে তখন?
রুবায়েৎ গলা খাঁকারি দেয়, “কই? দেখি?”
কলমা স্বাভাবিক হবার চেষ্টা করে “আজ দেরী তুমি করেছ!”
“গুনাহ কবুল, সাজা কী হবে?”
ঘরটার ছাদ নীচু হয়ে আসে। বাতাস কমে যায়। স্তিমিত হয় আলো। কলমা অস্ফুটে বলে “যেয়ো না।”
না শোনার ভান করে রুবায়েৎ। করতে হয়। নিজের জন্য। কলমার জন্যও।

“তসবীরখানা দেখো।”

জানালা দিয়ে রুবায়েৎ-এর উদাসীন, ইতস্ততঃ হেঁটে যাওয়া দেখতে থাকে কলমা। উপত্যকা পেরিয়ে যায়। কাস্পি সাগরও। “আসব”, বলে গিয়েছে রুবায়েৎ।

আজও, কে জানে, হয়ত শতাব্দী পার করে জানতে চাইছে কলমা, “কই, এলে না তো?”

ঝাড়ু হাতে অবিন্যস্ত দাড়িওলা লোকটা এসে বলে “নেবে?”
“সামর্থ্য নেই”, আমায় বলতে হয়, “এর দাম চোকানো আমার সাধ্যি কই?”
_________________________________________
ছবি সৌজন্যঃ বর্ষণা গোস্বামী।
Advertisements