মনটা আদপেই ভালো নেই। খারাপ খবরটা শোবার আগেই পেয়েছে অনির্বাণ, সেই থেকে উসখুস করছে লেপের ভিতর। ভীষণ গুরুতর সংবাদ। ঘুম আসবে না। অসম্ভব। যদি বা আসে, দুঃস্বপ্ন বাঁধা! শুন্যের থেকে চার দাগ নীচে এখন তাপমাত্রা, তাতে কামড় বেশী, আরাম কম। একে শীতকাল বলে না। খোলস ছেড়ে কুন্ডলী পাকিয়ে যোগনিদ্রা দিতে ইচ্ছে করে অনির্বাণের, সূর্য উঠলে, যদি ওঠে কোনো দিন, তুলে দিও।

শীতকালের সংজ্ঞা সেই শহরটা লিখে রেখেছে। শীতকাল ছুটি, রঙিন, মিঠে, আমেজ এই জাতীয় শব্দে বিশেষিত। ‘একটি শীতের দুপুর’ এর রচনাগুলো যে একবর্ণ ও মিথ্যে নয়, এই বয়েসে এসে অনির্বাণ সেটা উপলব্ধি করে। স্টিলের জামবাটিতে ঘন ঝোলাগুড়। ঝোলাগুড়ে পেটমোটা দৈত্যাকার ডেঁয়ো পিঁপড়ে। বাড়িতে থাকলে সাদা আটার হাত রুটি, নিভৃতে থাকলে তর্জনীর ডগায়, ওর বাড়ি নেমন্তন্ন থাকলে গুড়ের পায়েসে, বাজার ফেরতা বাজেট বাঁচলে ফেলুময়রার দোকানে।

আনচান ভাবটা অবজ্ঞা করা যাচ্ছে না। শুকনো, এই সময়টা বড় শুকনো। কিসের জন্য ঘুমোতে যাবে অনির্বাণ? সকালগুলো আজকাল প্রতিশ্রুতি করবার ভণিতাটুকু ও করে না। মেঘলা, শীতল দিন গুলো খুব ফাঁকা লাগে। পাতাহীন হাড্ডিসার গাছগুলোকে দেখে মনে হয় এরা কোটি বছর মৃত। এরা বাঁচতেই শেখেনি। দুর্লভ উষ্ণতাটুকু যত্নে তুলোয় মুড়ে রেখেছে সে। সকালবেলা কাজে যাবার সময় মাথা নাড়ে অনির্বাণ, না, ডিসেম্বর হলেই শীতকাল হয় না, যেমন পৌষ মানেই জানুয়ারী নয়। কলেজ যাবার আগে মা জোর করে মুখে ক্রীম মাখিয়ে না দিলে শীতকাল হয় না। অনির্বাণ ফেটে চৌচির ঠোঁটে জিভ বোলায়। সস্তায় কেনা কম্ফর্টারে দুপুরে পাঁচিল থেকে তুলে আনা, মায়ের পুরোনো শাড়ি দিয়ে ওয়াড় বানানো লেপের ওম কই?

অনির্বাণ বড় সময় গুলিয়ে ফ্যালে। এখন ভরদুপুর শহরে। আর এই মানবহীন প্রবাসে মাঝরাত। একটু আগেই মর্মান্তিক খবরটা ও দিয়েছে। একটা জোরালো রাগ আর ঝাঁঝালো দুঃখ হচ্ছে ওর উপর। অথচ কয়েক মুহূর্ত আগে অবধিও ও অনির্বাণের কাছে বেগুনপোড়ার উপর ধনেপাতার মত ছিল। সব ভালোকে যাচ্ছেতাই রকমের ‘সে কি ভোলা যায়’ করে তুলত ও, সব বাজে কে ‘আহ, এমন কী খারাপ’ বানাতে পারত। মিনিবাসে জানালার ধার দখল করে কাঁচ উঠিয়ে দিত, পৌষের পোষা হাওয়া ধাক্কা মারত, পরের দিন উদয় হত নাকে চিল্কা হ্রদ আর তোয়ালে রুমাল নিয়ে।

ওকে ফোন করেছিল অনির্বাণ। খুব খানিকটা উচ্ছ্বাসের সাথে বলে চলছিল ও, “আজ কড়াইশুঁটির কচুরী হবে বিকেলে। মা লেচির ভিতর পুর ভরছে এখন, হয়ে গেলে আলুর দমে হাত দেবে। শৌভিকদের ডেকেছি, বুঝলি, ইশ তুই থাকলে…”

গোটা চারেক “হু” ছাড়া কিছু বলেনি অনির্বাণ।
Advertisements