এক ফোঁটা ধুলো নেই। অথচ এমন নয় যে কাঁচের বাক্সে বা কাপড়ে মুড়ে রাখা ছিল। এর অধিষ্ঠান দিব্যি দেয়াল ঘেঁষা খয়েরী ঘুণ ধরা টেবিলটার উপর, কানাভাঙা ফুলদানি গুলোর পাশে। দু’প্রান্তে দুটো নব জুলজুল করে তাকিয়ে, মাঝের কোম্পানির নামের ইংরিজি হরফটা সত্তর দশকের বিজ্ঞাপন গুলোর কথা মনে পড়ায়। রেডিওটা কাঠের। মাস্টারমশাই বলতেন, শব্দযন্ত্রে, স্বাভাবিক আওয়াজে কাঠের জুড়ি নেই। ইলেক্ট্রিক গীটারকে বলতেন ঝ্যাঁ আর অ্যাকাউস্টিক কে টুং। বলতেন “নিজের টুংত্ব নষ্ট হতে দিস না”।

পাতালঘরে স্টেশন গুলো ঠিকমত ধরতে চায় না। ঝিরঝিরে একটা পর্দা যেন টানা থাকে সবসময়। বাবা বলেন নয়েজ। বেসুর হলেই নয়েজ? উঁহু। বেসুর বলে কিছু হয় না। সব কিছুই সুরে বাঁধা, এর কোনো ব্যতিক্রম নেই। আট মাসের মেয়েটা যে থেকে থেকে ফুঁপিয়ে ওঠে, তার ও সুর আছে বইকি, সেটা তার মায়ের নীরব অশ্রুপাতের সাথে এক-ই তারে না বাজলেই বুঝি নয়েজ? তবে নয়েজ কারে কয়? অবাঞ্ছিত আওয়াজ? বুকে সতর্কবাণী গেঁথে দেওয়া সাইরেনটা? তারপরেই বোমারু বিমানগুলোর শিস? তাদের সুর নেই, বাবা? দৈত্যগুলো বুটে তাল রাখে না? ওরা নয়েজ?

জায়গাটা বেসমেন্ট আসলে, পাতালঘর বলে ডাকলে একটা রোমাঞ্চ আসে। বর্জিত শহরের পরিত্যক্ত একটা বাড়ির পাতালঘরে কী যে গুপ্তধন পেয়েছে বাপ মা ছেলে মেয়ে… নোনা ধরা দেওয়ালগুলোয় শত্রুসেনার ছায়া দেখে সবাই, তবু কটা দিন বেশী বাঁচার ধন পেয়েছে মা। আলো আঁধারি পাতালঘরের কল্পরাজ্যটা অসীম সম্পদ ছেলেটার কাছে। কাঠের রেডিওটা বাবার নীলমণি। দিনরাত ব্যারিটোন কন্ঠ যুদ্ধের ধারাবিবরণী দেয়। সাধের শহর বানভাসি। আর হয়ত দুটো বিকেল…

পূবদিকটা ফিকে হওয়া শুরু করেছে বোধহয়। ভোর হতে আর বিশ মিনিট। পাতালঘর থেকে প্রিয় মর্ত্য কি দেখা যায়? দূরের কোণে নীল মশারির ভিতর তিনটে প্রাণী আশঙ্কাহীন ঘুমে ডুবে। ভয়ের উপর ক্লান্তি এসে গেছে ওদের। বাবা ছারপোকা সামলিয়ে সবুজ সোফাটায় পা গুটিয়ে প্রতীক্ষারত। পাশের বাড়িতে নিধনযজ্ঞ আরম্ভ হয়েছে। ওদের জাগিয়ে কাজ নেই। সব কিছু অনর্থক মনে হয় লোকটার। গোটা জীবনটা। শেষটা বড় অন্যায্য। ব্যারিটোন মৃদু কণ্ঠে কিছু অবান্তর জরুরী ঘোষণা সারে। একটা হতাশ রাগ জাগে তার ভিতর। কিন্তু শেষ অনুভূতি হিসেবে রাগটা ঠিক হবে কি? রেগে থেকে মরে কি লাভ?

বোতাম দুটোই ঘুরিয়ে দেন নবীন সঙ্গীতশিক্ষক। দমিয়ে রাখা ব্যারিটোন কন্ঠ বদলে যায় উচ্চরবে টেনর স্যাক্সোফোনে, মিহি সারেঙ্গীতে, অর্ফিয়ুসের বীণায়। আলি আকবরের সরোদে। মিয়া কি টোড়ি। ঝিরঝিরে পর্দাটা কখন যেন মিলিয়ে যায়। ভারী বুট গুলো নিশ্চল। কতক্ষণ গুলি চলেনি রে?

বুকে মেয়েটাকে আঁকড়ে ধরে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে মা। “ওরা শুনতে পেয়ে যাবে যে!” ছেলে বাপের গলা জড়িয়ে কী এক উল্লাসে বলে ওঠে “বাবা, শোনো, আর নয়েজ নেই!”

Advertisements