জিনিসটা স্বতস্ফূর্ত ভাবেই একটা ভয়ভক্তি আদায় করবে। তার ওজনের আন্দাজ চোখে দেখেই হয়। তার গুরুত্বও মালুম করতে বেগ পেতে হয়না বিশেষ। আর তাকে একবারটি ছুঁয়ে দেখার ইচ্ছে দমন করার শক্তি অন্ততঃ আমার নেই। দু পাশে চোরের মত তাকিয়ে বন্দুকটা খোপ থেকে হাতে তুলে নিলাম। হাত বন্দুক। আধুনিক রিভলবারের পূর্বসুরি। এক্ষুনি কাউকে দ্বন্দযুদ্ধে আহ্বান করতে হবে, হবেই। মাথা তুলে খুব আশপাশে তাকিয়েও বালবৃদ্ধবনিতা কাউকে পেলাম না মনের আশ মেটাতে। বৃথা, এ জীবন বৃথা। মনের দুঃখে কোমরবন্ধনীতে সেটাকে সেঁটে বিষণ্ণ, বিমর্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছিলাম, মনে পড়ল খোপ তিনেক আগে একটা বেলজিয়াম কাঁচের আয়না দেখেছিলাম।

অভ্যস্ত ধীর হাতে বোতামগুলি লাগালেন ভদ্রলোক। শেষের আগের বোতামটা খুলে পড়ে গেছে কোথাও। জীর্ণ লাল কোটের বুকে তারাকৃতি পদক, সবেধন নীলমণি  ওই একটি-ই জুটেছিল। তাই ভাঙিয়েই নাতি অবধি চলছে। “আমার দাদু বেয়াল্লিশের যুদ্ধে…” কলাটা (আগে মুলোটাও, কিন্তু ইদানীং গ্যাস হয়), কুচো মাছ, হলদে হয়ে যাওয়া সবজি এইসব জুটে যেত মেজরবাবুর খাতিরে। বেয়াল্লিশের যুদ্ধটা কেন হয়েছিল আজ আর কারো মনে নেই, কিন্তু জয় একটা  হয়েছিল, কারুর একটা বিরুদ্ধে, এবং ফি বছর ছুটি মেলে বলে জনগণ বেয়াল্লিশের সৈনিকদের ভিনটেজ গাড়ির মত পোষে। মেজরবাবুর স্মৃতিও সততই সুখের,  কত শত্রু নিধন যে তিনি করেছেন, গল্পে তার সংখ্যা শেয়ার সূচকের থেকেও বেগে ওঠানামা করে। মিলিটারি মেজাজ যদিও তার আয়ত্ত হয়নি, বহু চেষ্টা সত্ত্বেও। গিন্নী, ছেলেপুলের কাছে বরং পালটা দাবড়ানি খেয়ে গেছেন। সংসারে রণকৌশল খাটে না।

স্মারক আর সব-ই বেচা হয়ে গেছে। এই হাতলে আদ্যক্ষর খোদাই করা হাত বন্দুকটা কেমন করে যেন খোরাকির দাম হয়ে যায়নি। মুগ্ধ চোখে সেটার দিকে তাকিয়ে রইলেন মেজরবাবু। হ্যাঁ, তার হাতেই মানায়। আয়নায় নিজেকে জরিপ করেন ঋজু প্রৌঢ়, ডান হাত সটান তুলে ধরেন চোখের উচ্চতায়। তর্জনী অপেক্ষমান ঘোড়ার উপর। বাম চোখ কুঁচকে নিশানায় স্থায়ী হন তিনি। আয়না থেকে পাঁচ পা পেছোন, সম্মুখ সমরের ফয়সলা হোক। তর্জনী চাপ দেয় ঘোড়ায়, কিছুই হয় না। বাইরের মেজর দেখতে পান আয়নার মেজর ভূলুণ্ঠিত, ধূমায়িত নলে ফুঁ দিয়ে আত্মপ্রসাদ লাভ করেন তিনি। তারপর বিষণ্ণ বিমর্ষ  বেয়াল্লিশের মেজর প্রশ্ন করেন চিমসে লোকটাকে,

“কত দিবি?”
Advertisements