একটা সময় পর বুঝলাম হারিয়ে গেছি। আক্ষরিক ভাবেই। স্থানে নয় কেবল, কালেও। চারপাশে অগুনতি পায়রার খোপে ডাঁই করে রাখা যাবতীয় অকাজের যা কিছু, যা কিছু অচল, পরিত্যক্ত, প্রাচীন, আমি অনন্তের আন্দাজ পাই। ক্লান্তি আসে। আর বোধহয় হতাশাও। অনন্তকে জরিপ করবার মত সময় নেই বলে। ভয়ানক লোভ হয়, এই সব আমার চাই, এই যতকিছু সব আর কারো কাছে মূল্যহীন, যাদের গলায় নামমাত্র দাম লেখা কাগজ ঝুলছে, এই সব গল্প, গন্ধ, এগুলো চাই। কার কাছে বায়না করি? অনন্তের কোনো কেন্দ্রবিন্দু হয়না, তবু তার কাছাকাছি-ই কোথাও কোনো একটা খোপে একটা আবলুশ কাঠের কেদারায় বসে পড়লাম। ডানদিকের হাতলটা ভাঙা, একটা সাধারন গোল কাঁচ-মাথা টেবিলে হাতটা রাখলাম। লং প্লেয়িং রেকর্ড ছিল কটা – টম টি হল চেনা বেরোলো, তাই উল্টেপাল্টে দেখছিলাম কোলে নিয়ে, শেষ রেকর্ডটা তুলতেই একটা খুব চেনা কিন্তু একেবারে অন্যরকম দাবার ছক বেরিয়ে পড়ল। কষ্টিপাথরের। এদিক ওদিক ঝুঁকে খুজতেই একটা বার্লির টিনে মিলল সৈন্য সামন্তরা। ঢেলে সাজালাম তাদের। পাইন কাঠের, এবড়ো খেবড়ো। বোড়ে গুলির নিজেদের মুখ রয়েছে, নিজেদের অস্তিত্বে সচেতন। তারা অসমান, কেউ বেশী লম্বা, কোনটা একটু মোটা। সাদা মন্ত্রীটা বেশ রাগী, সাদা রাজাটা ভীতু। কালো রাজাতে আর মন্ত্রীতে গলায় গলায় ভাব, দুজনেই বড় দুঃখী। নৌকা, গজগুলো কেমন ভাবলেশহীন, যান্ত্রিক, ভাড়াটে খুনীর মত। প্রথম চাল টা আমি দেব?

“উঁহু, আমি।”

প্রায়-জোড়া ভুরু টা কুঁচকে বললে ছোট্টখাট্টো চেহারার মেয়েটি। হালকা মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো বিশালাকায় যোদ্ধা। মেয়েটির গ্রাম ইতিহাস হয়ে গেছে ঘন্টা খানেক আগে, দলছুট যোদ্ধারও আর হারাবার কিছু নেই। তার পক্ষ নেই, তার ফৌজ ফৌত। যুদ্ধের কারণ, ক্ষেত্র, অংশীদার সব বিশৃঙ্খলায় ঘেঁটে গেছে, তবে তাই নিয়ে বিশেষ বিচলিত তাকে দেখাচ্ছে না, অবশ্য তার মুখের ভাবে তাকে পড়তে যাওয়া কঠিন। মেয়েটির কোনো অভিযোগ নেই যদিও, ভবিতব্য বলে মেনে নিয়েছে সবকিছু, আর এখন ক্ষুদে পাহাড়ের উপরে বসে শুকনো ডালপালার আলোয় দাবা খেলছে শয়তানের সাথে। শয়তানের একটা ঘোড়া আড়াই ঘরী চালে তার কৌতূহলী বোড়েটাকে গ্রাস করেছে। মুখ টিপে হাসে মেয়ে।

“এগুলো তুমি বানিয়েছ? নিজে হাতে?”

আবারও নীরবে মাথা নেড়ে সম্মতি জানায় যোদ্ধা। বহু নীচের বৃহত্তর আগুনটা নিভে গেছে, গ্রামটা যথার্থই ছারখার, আর ইন্ধন নেই কোনো রকম। কাছের ছোট আগুনটা জ্বলছে এখনও, তার হলদে আলোয় রক্তিম হয়ে উঠেছে মেয়েটা। তার এক পায়ে নূপুর। তার অনেকখানি বিপজ্জনক ভাবে অনাবৃত। যোদ্ধা কী দুর্বল হয়ে পড়ছে? সে টের পায়, আরও একরকম আগুন হয়, আর সেটা অনির্বাণ। চোখ নামিয়ে দাবার ছকে মনোযোগ দেয় সে, সজাগ চোখে সুযোগ খোঁজে, কোনাকুনি ফাঁক পেয়ে একটা নৌকাকে ডুবিয়ে দেয় তার গজ। মেয়ে তার চোখে চোখ রাখে, মুখ ব্যাঁকায় এমন ভাবে, যা কেবল সে-ই পারে। দানবটা কি হাসল একটু?

“হচ্ছে তোমার দাঁড়াও!”

মৃত ঘুঁটির পাহাড় জমতে থাকে। কমতে থাকে আগুনের তেজ। সৈনিক তার ক্লান্ত মাথা তোলে আকাশের দিকে, তার যন্ত্রণাবিদ্ধ আঙুল তুলে কন্যারাশির দিকে তুলে ধরে। বুভুক্ষু মেয়ে হাসে পাহাড়ে প্রতিধ্বনি তুলে, তার তর্জনী সিংহরাশির দিকে উদ্ধত। শয়তানের কোণঠাসা রাজাকে কিস্তি দেয় মেয়েটা। মাত। সেই খিলখিল হাসির অর্থ পরিষ্কার হয় এবার। একজন ভালো যোদ্ধা জানে কখন হার মানতে হয়। সকাল হয়ে আসছে।

Advertisements