সময় থমকে দশটা দশে। একটা মেহগনির বাক্সে যত্নে শোয়ানো, বলা ভালো ঘুম পাড়িয়ে রাখা তাকে। পালিশের অভাবে তার সোনার বর্ণে ঔজ্জ্বল্য কিছু কম, শ্বেতপাথরের বুকে সোনার জলে রোমান হরফে নম্বর আঁকা, কাঁটাগুলিও সোনার। নিখুঁত বৃত্তে একটু টোল খেয়ে গেছে একপাশে, তাতেই পকেটঘড়িটা একমেবাদ্বিতীয়ম হয়ে গিয়েছে। উৎসুক হয়ে হাতে তুলে নিলাম, কুন্ডলী পাকানো চেনটা খুলে পড়ল অসাবধানে। চমকে, অপ্রস্তুত হয়ে ঝুঁকে তুলে নিলাম সেটা, ট্যাঁকঘড়ির মাথায় পড়িয়ে দিতেই নড়ে উঠল সেকেণ্ডের কাঁটা। চোখকে অবিশ্বাস করে কানে লাগিয়ে শুনলাম, সচল ঘড়ি আরও কিছু বলছে না?

সময় থমকে দশটা দশে। একটা মেহগনির বাক্সে যত্নে শোয়ানো, বলা ভালো ঘুম পাড়িয়ে রাখা তাকে। নিয়মিত পালিশে উজ্জ্বল কাঞ্চনবর্ণ সে, শ্বেতপাথরের বুকে সোনার জলে রোমান হরফে নম্বর আঁকা, কাঁটাগুলিও সোনার। সদাগরী আপিস থেকে ফেরার পথে কেরানি বাপ আর ইশকুল থেকে ফেরার পথে বছর পনেরোর ছেলেটার চোখ আটকে যায় রোজ মেহতাবের ঘড়ির দোকানের সামনে। ছেলে ভূগোল বইতে সুইজারল্যাণ্ড চিনেছে, বাপ জেনেছে এই বিশ্বযুদ্ধের বাজারে এক ওই দেশটাই সামিল হয়নি কোনো পক্ষে। বুড়ো মেহতাব আর তার দ্বিতীয় পক্ষের জোয়ান ছেলে কাসেম ঘড়ি কেনে বন্দর থেকে, কোম্পানির চোখ এড়িয়ে। তাদের ভাণ্ডারের বেশীরভাগ-ই বিলিতি, সুইস আমদানী এই প্রথম। বড় দাঁও মারবার তালে রয়েছে বাপ ব্যাটা, অন্য জোড়া কেবল দু’দণ্ড দেখেই শান্তি পায়। না, শান্তি পায় না, একটা দুনির্বার আকর্ষণ কুরেকুরে খায় তাদের। অমিয় জানেনা ছেলের বাসনার কথা, অনন্ত টের পায়না তার বাবাও এক-ই বড়শিতে গেঁথে। অনন্ত বড় হচ্ছে, দারিদ্রের অর্থ সে বোঝে। অমিয় বুঝে উঠতে পারে না, এই কামনার উৎস কোথায়, এত স্পর্ধা-ই বা তার হয় কী করে সুইস ঘড়ি ট্যাঁকে নিয়ে ঘুরবার স্বপ্ন দেখার! জিনিসটার কোনো উপযোগিতাই নেই তাদের কাছে, সামর্থ্যে কুলোনো তো দূর প্রশ্ন।

একদিন বুড়ো মেহতাবের ঘড়ির দোকানের সামনে দেখা হয়ে যায় বাবা ছেলের। কাঁচের দেওয়ালে নাক ঠেকিয়ে খালি শোকেসটার দিকে তাকিয়ে থাকে তারা। তাদের দীর্ঘশ্বাসে স্বচ্ছ কাঁচে বাষ্প জমে। আপিস, ইশকুল কামাই যায়। ব্যস্ত শহরের পথে অলস পদক্ষেপে হাঁটতে থাকে তারা, হাত ধরে, কোথাও পৌঁছনোর তাড়া নেই। সময় থমকে যায়।
Advertisements