ছদ্মবেশটা নিখুঁত। আলগা চোখ বোলালে মনে হবে একখানা পুরোনো টেবিল বুঝি। সামনের হরেক আসবাব সরিয়ে ফুলদানিগুলোর দিকে এগিয়ে গেলে যদি মৃদু ধাক্কা লাগে, কঁকিয়ে উঠবে পিয়ানোটা। আশপাশের সুগোছালো ধ্বংসস্তূপের মধ্যে মরূদ্যান মনে হবে যন্ত্রটাকে, হাতের পিঠ দিয়ে ধুলো ঝেড়ে ছোট চেয়ারটায় বসে চাবিগুলোয় আঙুল ছোঁয়ানো মাত্র স্পটলাইট এসে পড়বে যেন। “স্পর্শ করিবেন না” চিহ্নটা উপেক্ষা করাই শ্রেয়। চোখ বন্ধ করে, সামনের হাজার আসনের অদৃশ্য শ্রোতাদের কোলাহলকে  প্রতীক্ষা আর উৎকণ্ঠায় পরিণত করে জ্যোৎস্নারাতের খেয়াল শুরু হবে। 

 
রাত। হ্যাঁ, রাত-ই। হিসেব অনুযায়ী দিন-রাতের তেমন তাৎপর্য তাঁর কাছে থাকার কথা নয়, তবু অশীতিপর  অন্ধ বৃদ্ধ বুঝতে পারেন রাত হয়েছে, রোজ এই সময়েই রাত হয়। বছর সাতেক আগেও হত, যখন এই ঘিঞ্জি শহরের প্রান্তে জঞ্জালমুখর নিকাশিনালার পাশের এই ঘুপচি বাড়িটার এক চিলতে বারান্দা থেকে সপ্তাহভর বৃষ্টির পর নবমীর চাঁদ উঠতে দেখে বাস্তবিক -ই ক্ষিদেটা একটু কম লাগত তাঁর। ছানির স্তর পেরিয়ে চাঁদ আর দেখা হয় না তাঁর, ক্ষিদেও আজকাল তেমন পায় কই? তবু আজ রাত হওয়াটা টের পেলেন তিনি। আরামকেদারাটা থেকে উঠে ঘরময় ছড়িয়ে থাকা বইএর স্তূপ সরিয়ে কোনাটায় পৌঁছে অধৈর্য কাঁপা হাতে ঢাকা চাদরটা সরিয়ে দিলেন বৃদ্ধ। ভেজা হাওয়ায় বর্জ্যের গন্ধ ঢেকে কোথাও থেকে একটু রজনীগন্ধার আভাস। সাত বছরের অভিমান তারসপ্তকে বাঁধা, তাকে সামলানোর পন্থা স্বরলিপিতে থাকে না। বুড়ো পিয়ানোয় চন্দ্রালোকের ধ্রুপদ শুরু  করলেন বৃদ্ধ। মন্দ লয়, দুই অস্ফুট স্বরের মধ্যে অসীম নিঃশব্দ, রজনীগন্ধা ফিকে হয়ে তামাকের ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে ঘরে। লয় বাড়ে, শ্বাস ঘন হয় বৃদ্ধের, ষোল মাত্রায় ফিরে ফিরে আসে মাদকীয় স্থায়ী, ষষ্ঠদশ কলায় সাক্ষী থাকে চাঁদ, ধূপ পোড়ে কোথাও। মখমলের মত চাবি স্পর্শ করে যায় বয়স্ক আঙুল, রাতের ট্রেনটা তাল রাখে, মধ্যমে হুইসল মেলায়, মন্ত্রে মুগ্ধ হয়ে ঘুম ভেঙে উঠে বসে আবর্জনার শহর। ক্লান্তি, গ্লানি, খেদ ভুলে রোম্যান্টিক সিনেমার সুখী সমাপ্তির দিকে রাতটা এগোয় যেন,  আবহসঙ্গীতে মৃত্যুকে আবাহন করেন বৃদ্ধ। অবশ হয় সময়, শহর। দ্রুত অন্তরায় সেই পরিচিত, কাঙ্খিত ঘ্রাণ পান তিনি, দরজায় হেলান দিয়ে একাগ্রচিত্ত শ্রোতা তাঁর, তাঁর প্রথম শ্রোতা। দৃষ্টি ফোটে বৃদ্ধের, শ্বাস কমতি হয়, আঙুলগুলো এলোমেলো চাবি হাতড়াতে থাকে। 

অনৈসর্গিক মুনলাইট সোনাটা অসমাপ্ত থেকে যায়, অন্ধকারের হাজার শ্রোতার মোহ কাটে না, একটাও হাততালি পড়ে কই?

“স্পর্শ করা মানা কিন্তু। জরিমানা হবে।” হাত সরিয়ে নি। আমার এ যন্ত্র ছোঁয়া মানায় না।
Advertisements