সুবিশাল ঘরটার প্রায়ান্ধকার কোণে দেরাজের দ্বিতীয় তাকটায় সারি বেঁধে রাখা ছিল তাদের। পুরোন কাঠের বার্নিশ আর ন্যাপথলিনের গন্ধ ছাপিয়ে আর একটা সুবাস আচ্ছন্ন করে রেখেছে। আমি কাঠের মত দাঁড়িয়ে রয়েছি দেরাজের সামনে। দ্বিতীয় তাকের সারি বাঁধা স্ফটিকের গ্লাসগুলি থেকে ঠিকরে বেরোচ্ছে চুঁইয়ে আসা আলো। চোখে ঝিলমিল লেগে গেছে! খুব সাহসে ভয় করে তর্জনী ছোঁয়ালাম তাদের একজনায়, ছ্যাঁকা লাগল যেন, স্ফুলিঙ্গ ছুটল।

স্বচ্ছ। এই একটাই শব্দ অবস্থান করছে ঘরে। দেওয়ালগুলি কাঠের বটে, পূব দিকে চূল্লীটা, তার আগুন-ই এখন এক মাত্র আলোর উৎস। পশ্চিমে একটা জানালা, তাই দিয়ে বেশ ক ঘন্টা আগে দিনের শেষ আলো হঠাৎ-ই উধাও হয়েছে ইসমাইল সামানি পর্বতের পিছনে। চাঁদ উঠেছে কিনা সেটা স্পষ্ট নয়। মেঘ ভারী হয়ে রয়েছে। ঘরের চুল্লীটার হলুদ আলো বেশ খানিক দূর দৃশ্যমান করে তুলেছে, সর্বব্যাপী বরফ তাই নিয়ে লোফালুফি খেলছে। প্রতিফলন ঘরের বাইরে, ভিতরে প্রতিসরণ। অন্দরমহলের প্রবেশপথে একটা সাদা পর্দা ঝুলছে, দুলছে হুহু ঠাণ্ডা হাওয়ায়। মিহি তার বুনোট, স্বচ্ছ। আগুনের তাপে তার শীতলতার সাথে বেদম যুদ্ধ। চুল্লীর উপরের অতিকায় শিং ওলা হরিণের মাথা টা সাক্ষী। কাঠ পোড়ার একটা অদ্ভুত শব্দ আছে, জানালা দিয়ে গলতে চাওয়া হাওয়ার গোঙানিকে সান্ত্বনা দিচ্ছে যেন। সেই চুল্লীর সামনে একটা চারপায়া রাখা। তার উপর রাখা একটা স্বচ্ছ বোতল, তাতে মধুসদৃশ এক তরল, কিন্তু তার ঘনত্ব কম। অনেক বেশী স্বচ্ছ। কোহল কি সঞ্জীবনী জানা নেই। সেই বোতলের পাশে এক জোড়া যমজ স্ফটিকের পেয়ালা। তাদের শরীরে যেন গান্ধারের ভাস্কর্য।

 

পারস্যে বা ব্যবিলনে নাকি বাঙলা তেই এক রানীর গল্প শুনেছিলাম। তার পোশাক মাকড়সার জালের থেকেও মিহি রেশমে বোনা, এক কাপড় তিনি দুবার পরেন না। নিরাভরণা তিনি, সোনা রূপা প্ল্যাটিনাম এগুলি কেবলই ধাতু তার কাছে। সেই স্বচ্ছবাসে, সহজ পায়ে, সফেন পর্দা ঠেলে ঘরে ঢুকলেন তিনি। কিছু আগুন কেবল জ্বলে, বাঞ্ছারাম, পোড়ে না। রানী চারপায়ার উপর ঝুঁকে তার মরালগ্রীবা সম বাহু দিয়ে বোতল তুলে নিলেন, গলা সোনার মত সে তরল কলকলিয়ে পেয়ালা ভরে তুলল। রানী যমজের একজন কে তুলে দিলেন তরুণ বৃদ্ধের হাতে। যে বৃদ্ধ রাজা ছিলেন একদিন। দুই পেয়ালায় চুমু খেলো মৃদু ঠং শব্দে। বাইরে বরফপাত শুরু হল। বৃদ্ধের চোখের ইশারায় রানী জানালা বন্ধ করে দিলেন।

হাত সরিয়ে নিলাম। চোখ খুললাম। পেয়ালার কানায় এখনও তার ঠোঁটের ছাপ লেগে রয়েছে বুঝি…
Advertisements