( লেখা টি এক ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারীর। আমার প্রবাসের তখন দেড় মাস বয়স। এই বছর কলকাতার মত এখানেও শীতের আড়ি।)
খেলা পাল্টে গেছে। যেমন পাল্টেছে দুই ওভারের মাঝে বিজ্ঞাপনগুলি… মোটের উপর সব ই শেষ হত “আজই নিয়ে আসুন নতুন, আরও উন্নত … । ” এই অ-বার্নপুরের মাস দেড়েক সেরকম ই নতুন… অবিশ্যি উন্নত কিনা তা বলার সময় এখনো আসেনি! বাইরে বেরোই আপাদমস্তক ঢেকে, খোলা চামড়ায় শেষ শীতের উত্তুরে হাওয়া কামড় দেয়। কিন্তু মুখ বুজে সইতে হয়, প্রথম বার নালিশ করে  বেকুব বনে গেছিলাম যে! যেই বললাম “আজ বেশ জাঁকিয়ে বসেছে ঠাণ্ডাটা” , অমনি উত্তর এলো “Really? You call THIS cold? I come from Pittsburg, dude, and it’s like seven inches of snow on my porch!” ওই উজবুক কে কে বোঝায় আমার শহরে শীতকাল আসে ময়দানের কুয়াশায়, বারন্দায় রোদ পোহানো কমলালেবুতে, ধুলো ঝেড়ে আলমারির মাথা থেকে নামানো ব্যাডমিন্টনের র‍্যাকেটে, বাজারের থলে থেকে উঁকি মারা কড়াইশুঁটি, গাজর আর ধনেপাতায়, আর ঠাকুমার হাতে বোনা সোয়েটারে। সেই ননীর শরীর যে আচমকা এই “নেতিবাচকের” দেশে এসে উফফ কী ঠাণ্ডা বলে কাতরাবে, তাতে আর আশ্চর্য কি? অদ্ভুত এদের আবহাওয়া! তাপমাত্রা নামবে হিমাংকের নীচে, পুরু জ্যাকেটের আস্তরণ ভেদ করে সুড়সুড়ি দেবে, দস্তানাহীন হাত পকেটের বাইরে রাখলেই কঙ্কালসার হবার যোগাড়, অথচ তুষারপাত দেখার সৌভাগ্যটুকু দিতে রাজি নয়! “এ বড় ঠিক কথা নয় রাজামশাই!”
 
        রান্না করে , বেড়ে কেউ খাওয়াবে না। সুরাতকলের মেস ও নয়, যে দিনে চারবেলা নাম মাত্র অখাদ্য যুগিয়ে যাবে! অতএব নিজেকেই হাত পুড়িয়ে রাঁধতে হবে। (নাপিতেরা যে দর হাঁকে, তাতে দুদিন পরে চুল ও বাঁধতে হতে পারে।) তবে রান্না কাজটা মন্দ নয়। হপ্তায় একদিন বাবার মত বাজার যাও, দেখে শুনে টিপে টুপে দশাসই পেঁয়াজ, লাল টুকটুকে টমেটো, প্যাকেট পোরা ফুলকপি , মটরশুঁটি , ভুট্টার দানা ঠেলাগাড়িতে চাপাও। ভাল করে খুঁজলে তেলাপিয়া মাছ পাবে, কাঁটা বাছা, আঁশ ছাড়ান। নি-হাড্ডি মুরগি ও মিলবে, গরু শূয়র ভেড়া… পরের দিন মানুষখেকোদের aisle এ ঢুঁ মারতে হবে। ওই এক-ই ছাদের তলায় টুকাই বসে চাল নিয়ে। আর মেক্সিকান দের দৌলতে তৈরি রুটি ও মজুত। গোবিন্দ কাকুকে লিস্টি দিয়ে এলে সে মাসকাবারি মশলা আর টুকিটাকি চাপাবে তোমার ঠেলাগাড়িতে। তার পারিশ্রমিক হল ” Thanks a lot for helping me with these stuff, I appreciate that! “। 
 
       আমি বাড়ি ফিরলে কেউ লেবুর শরবত তৈরি করে রাখে না। তাই এক বোতল লেমনেডের ব্যবস্থা করেছি। বাজার মেঝেতে ছড়িয়ে ফ্রিজে জায়গা খুঁজি। সবাই শেষ পর্যন্ত মা এর মন্দিরে বসার স্থান পায়। আমার সহবাসিন্দাটি হাসে, বলে আমি নাকি “overshop” করে ফেলেছি। তারপর বৈদ্যুতিক উনুন জ্বালিয়ে তাতে কড়াই চাপাই। মা এর মতন। বঁটি থাকে না ঘরের কোনায়, ছুরি দিয়েই কুটনো কুটি। কাঠের খুন্তি নেড়েচেড়ে রাঁধি… রেসিপি সব স্ব-উদ্ভুত! ‘আন্দাজ মত’ নুন চিনি দিয়ে গরম গরম পরিবেশন করি। তারিফ ও নিজেকেই করতে হয়। এখন নিজেই জানি ক কৌটো চালে কত ভাত হয়, প্রেশার কুকার কখানা শিস দিলে বুঝব সেদ্ধ হয়েছে! আর খাওয়া খতম হলে পর এঁটো  বাসন গুলো ধুয়ে ফেলি, জোছনা’র ক্ষিপ্রতায়। 
 
     নতুন সাইকেলে করে ঘুরি মাঝেমধ্যে। আর কয়েকদিনে কোনও (অপেক্ষাকৃত) নবাগত কে রাস্তা বাতলাতে পারব বোধহয় । “ওই যে, শান্তিনগরের সেতু টপকে বন্দিপুর রোড ধরে সো ও জা, মিস্তিরিপাড়ার মসজিদটা, অরবিন্দ পার্কের ক্লাবটা পেরিয়ে ওই যে স্যানিটারির দোকানটা, ওর পিছনেই…” নতুন ঠিকানা… জ্যাকারির গাড়িতে navigator এর যান্ত্রিক কণ্ঠ বলে ওঠে ” Take a left on West Glenn Avenue, drive for three miles…” ভারি পায়ে দোতলায় উঠে চাবি ঘুরিয়ে দরজা খুলি। নতুন বাড়ি। 
Advertisements