বাড়িময় লোক। রাগ লাগে। এত আত্মীয়তা পাতাবার কি দরকার কে জানে! দুপুর থেকে হ্যাংলার মত এসে বসে আছি, অন্ততঃ ঊনিশ জন কে জীবন বৃত্তান্ত বলেছি, আপাতত একটা কোনায় সেঁধিয়ে ফেলু মিত্তিরের মত অবজার্ভ করছি। পর্যবেক্ষণ। একটা তোপসেও নেই যে চাঁটি মেরে হাতের সুখ করব। ওই টেকো পিসেমশায় মার্কা লোকটা কে…

ক্লু। সুরাগ। সূত্র। কোনটাই সুবিধের ঠেকছে না। ক্ষণে ক্ষণে ওর মা হাঁক পাড়ছে, বোনপো টা ওর ঠ্যাঙ জড়িয়ে ঝুলছে, ” বাহ, কি মিষ্টি দেখাচ্ছে” বলে গাল টিপছে কতজনা, আমি কড়ার লুচির মত ফুলছি। এদিকে দেখবার তো নাম ই নেই, ওই চালকুমড়োর মত ছেলেটার সাথে এত ভাব, যে… না, মাইরি বলছি, চালকুমড়ো ছেলে খারাপ নয়, তার অভিসন্ধি নিয়েও সংশয় নেই, কিন্তু তাই বলে এমনি ভাবে আমার চোখের সামনে? ওই দেখ, ওর হাতে ঘুষি মারছে খেলাচ্ছলে কেমন, ঘুষি কাকে বলে দেখবি?

একবার ভাবলাম চলে যাই। জাহান্নামে যাক ও। ও আর ওর আদরের চালকুমড়ো দা, লাউ কোথাকার। আবার ফেসিয়াল করেছে! হুহ! সেটা শোনানোও হয়ে গেছে আমায়, “মুখ টা উজ্জ্বল লাগছে না?” লাগছে। আমার চোখ পুড়ছে। তাত লাগছে, আঁচ লাগছে। আমপোড়ার শরবতের ভাণ্ডার আমার হাতেই শেষ হবে আজ। চতুর্থ গেলাস টা তুলতেই ও কোথায় হারিয়ে গেল। যাব্বাবা, শরবতে বিয়ার ছিল নাকি? আমার পেয়ারের কোণা থেকে বেরোলাম। ঢেউ এর মত লোক ঠেলে এ ঘর ও ঘর করেও কোনো পাত্তা পেলাম না। আড়চোখে দেখলাম চালকুমড়ো চটি গলাচ্ছে পায়ে, বেরোবে। যাক। আপদ মিটল। কিন্তু…

হাই উঠছে এবার। বেলা পড়ে আসছে। নীল এর উপর সাদা ফুল আঁকা চুড়িদার এর মালকিন এর পাত্তা নেই। শীতের বিকেল বড় তাড়াহুড়ো করে। পোলাও , পাঁঠার পাট খতম, পান মুখে ল্যাধ খাচ্ছে সবাই। শাল জড়িয়ে সিঁড়ির ঘরে এলাম, এখান থেকে ওর অন্দরমহল টা চোখ পড়ে, ওই ঘরেই তো… খারাপ লাগাটা জড়িয়ে ধরে। আয়নার পাশে ওর আঁকা একটা মা দূর্গার ছবি, ডাগর চোখে হাসি মুখে তাকিয়ে, তাকে সাক্ষী করেই ওর শরীরের গন্ধ নিয়েছি, কিন্তু সে যেন এক যুগ আগে। গন্ধ টা ধাক্কা মারে, আমি দ্রুত পায়ে সিঁড়ি বেয়ে ছাদে চলে আসি।

আলো কমে এসেছে আরো। একটা করে বাতি জ্বলতে শুরু করেছে রাস্তায়। ঘুড়ি উড়ছে দু একটা এখনো। দড়িতে ক্লিপ দিয়ে ঘরের জামা মেলা। বাতাস ভারী হয়ে আসে। ভিড়ে ঠাসা বারুইপুর লোকাল টা বুকের উপর দিয়ে হেঁটে যায় যেন। রিকশা গুলো প্যাকপ্যাকাতে থাকে। পরিযায়ী পাখির ঝাঁক ঠিক ঝিল খুঁজে নেয়। একটা শহর জাগে, একটা ঘুমোয়।

ও যে পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে, সেটা টের পাই সিগারেটের গন্ধে। “জ্ঞান দিস না দয়া করে, মাথা ধরে গেছে বকবক করতে করতে আজ, একটা ছাড়া চলবে না” আমি চুপ করে ধোঁয়া ছুঁই। ও হাসে, শব্দ না করে। আমি দেখি, নির্নিমেষে। “অর্জুন, তুমি কি দেখতে পাচ্ছ?” দ্রোণাচার্য জানতে চান, “দুই ভুরুর মাঝে লাল টিপ টা”, আমি উত্তর দি। পোড়া সিগারেট টা মাটিতে ফেলে সেটা কে চটির তলায় পিষে ফেলে ও, ব্যথা আমার লাগে। দু হাতে ওর মুখ তুলে সহসাই কি ভীষণ সাহসে আমার মুখ ছুঁইয়ে দি। পোলাও, পায়েস, সিগারেটের তিক্ততা ছাপিয়ে শেষ পাতে আরেকটা স্বাদ জিভে লাগে। ও কাঁদছে। কপালে কপাল ঠেকিয়ে কলকাতার গোধূলিতে দুজনে দাঁড়িয়ে থাকি। চোখ বুঁজে আমার চুম্বন ফিরিয়ে দেয় সে, হিম এর স্পর্শ পাই মাথায়। কিছু নিঃসীম মুহুর্তের পর ঠোঁট সরিয়ে আমার বুকে ওর ফেসিয়াল করা মুখ টা গুঁজে দিয়ে বলে ” যেতে দে, নীচে সবাই…”

আমি বলি ” হজমোলা খাবি?”

Advertisements