আজ ও লেট। সতেরো মিনিট আগের ছোট্ট বার্তায় লিখেছে “এইত্তো, আর দু মিনিট, পৌঁছে গেলাম বলে!” মিথ্যে। ডাহা মিথ্যে। গতরাতের যাবতীয় পুরকি আজ সকালের ল্যাধে চাপা পড়ে গেছে। ও আদৌ বাড়ি থেকে বেরিয়েছে কিনা সন্দেহ। চাদর লণ্ডভণ্ড করা বিছানাটায় মুখ গুঁজে পিছন উলটে পড়ে আছে। উঠে প্রাতঃকৃত্য সেরে বেরোতে হবে ভাবলেই গায়ে জ্বর আসে ওর, হুমদো খরগোশ একটা। আমি আর দশ মিনিট দেখবো, এক মুহূর্ত ও বেশী নয়। ফেরত চলে যাব তারপর।
 
মাথায় চিড়বিড় করছে। আমার চারপাশে একটা ব্যস্ত শহরের ক্যানভাস। তাতে অবিরাম রঙ পড়ছে, ধুয়ে যাচ্ছে। কখনো সেটা হাজরার মোড়, কখনো রাসবিহারীর জননী টেরেজা জুলজুল করে তাকিয়ে আছে লিলিপুট মানুষ দের দিকে। কখনো আবার ভরদুপুরের সদাব্যস্ত ধর্মতলা, বা হগ মার্কেটের পিছনে, চাঁদোয়া টাঙানো সুরমা, আতর, সিমুই আর সুবাসিত গোস্তের দোকান। একটাই সূত্র এই বিচিত্র ছবিগুলোর। এতে আমি আছি, আর সে নেই।
 
 সে কোনো রকমে তার উলের বলের মত শরীর টা নিয়ে রাস্তায় বেরিয়েছে, আমি মনশ্চক্ষে দেখতে পাই। জাগতিক সবকিছুর উপরেই সে ক্ষিপ্ত। এত inertia কাটাতে মাথা গরম হয় বইকি। ঠাকুমা, কাজের মাসির উপর একপ্রস্থ বিষোদ্গার করে এসেছে, রিকশাওলা টা প্রমাদ গুনছিল, নেহাত সময়ে হাজির হয়ে বেঁচে গেছে। বাস রাস্তায় এসে প্রবল সমস্যায় পড়ে সে। “ছেলেটা যেন কোথায় দাঁড়াবে বলেছিল?” আবছা কিছু নাম মাথায়, প্রতিটা নামের পাশে একেকটা রঙ। আনোয়ার শাহ’র পাশে লাল ঢ্যাঁড়া দিয়ে কাটা, কদাপি নয়। “ও তবে কোথায়? এক্সাইডের মোড়ে? কোন বাস টা যেন? (নীল হলুদ না লাল হলুদ?) ও না! সিনেমা যাবার কথা তো! গড়িয়া বা গড়িয়াহাটে। অবশ্য আধ ঘন্টা আগে সে সিনেমা শুরু হয়ে গেছে! তাতে কি? ওকে কনুই দিয়ে গুঁতিয়ে জেনে নেবো।” যেন আমি ভিতরে ঢুকে বসেছিলাম পপকর্ন হাতে, পায়চারি করছিলাম না। যেন ঘন্টা দুই কাটাইনি কোনো এক ধুলোবহুল ফুটপাথে বসে। তাতে ওর কি? ওর ফাঁকা বাস ছাড়া চলবে না!
 
আমি অপেক্ষমান থাকি। ঋতু বদলে যায়, বাসভাড়া বৃদ্ধি পায়, ইনজামাম ক্রিজের এপার থেকে ওপারে পৌঁছে যায়, ইরাক থেকে মার্কিন সেনা রা দেশে ফেরে, মনমোহন সিং মুখ ফুটে শেষমেশ কিছু একটা কথা বলেই ফেলেন, (শোনা যদিও যায়না), ভারতে আচ্ছে দিন এসে যায়, ফলস্বরূপ যাদবপুর থানার সিগনাল টা অব্ধি খুলে যায়, সে আর এসে পৌঁছয় না! আমার জীবনের বৃহত্তম কুমির ডাঙা খেলে চলেছি আমি। ” সাড়ে দেড়টা বাজিল, এখনো কুমির এলো না” 
 
খুন করার কত রকম পন্থা আছে, ভাবি। মাথার পিছনে থান ইটের চুম্বন? নাকি এক ধাক্কায় হাওড়া গামী ওভারলোড ৬ নম্বরটার তলায়? আগে গোটা ছয় ঘুষি মেরে নেবো। ল্যাং মেরে ফেলে দেবো নোংরা নর্দমায়। আচ্ছা আমি দাঁড়িয়ে কেন এখনো? চলে গেলেই তো মিটে যায়! উঁহু , টু লেট ফর দ্যাট, আজ একটা হেস্তনেস্ত করা দরকার। 
 
একুশ শো তিন খানা হলদে সবুজ অটো এসে থামে, বা ঊনিশশো ছেচল্লিশ খানা বাস, ছ শো সাতাশি খানা ট্যাক্সি। ধর্মতলায় থামে, রবীন্দ্র সদনে, হাজরায়, সেলিমপুরের মোড়ে থামে। সে নামে… নীল হয়ে, লাল হয়ে, সবুজ, মেরুন, আর নানা রঙে, বা সাদা কালোয়। সে এগোয়, রাস্তার ওপার থেকে, হাসতে হাসতে। উঁহু, দাঁত কেলাতে কেলাতে, আমার চোয়াল শক্ত হয়, কড়া শব্দ খুঁজি। রাস্তাও পেরোয় সে অনন্ত কাল ধরে, এসে আমার ফুল হাতা সোয়েটার বা পাঞ্জাবীর হাতাটা তুলে কবজির কাছটা চুলকায়। ঘাড় বেঁকিয়ে বলে ” স অ অ অ রি ই ই” 
আমি বলি, ” বড্ড দেরী করে ফেললি।”
Advertisements