পূরবে নীরব ইশারাতে, একদা নিদ্রাহীন রাতে… 
 
বৃষ্টি থেমেছে খানিকক্ষণ আগে। ঝিঁঝিঁ  ডাকছে। আলো ফেরেনি এখনো। আকাশ টা লাল হয়ে আছে, অমাবস্যা নয়, কিন্তু চাঁদ আদৌ আছে কিনা, কে বলবে? বাইরেটা থমথম করছে, ভেতর টাও গুমোট। কাছাকাছি কারো বাড়িতে রেডিও বাজছে ব্যাটারিতে, ‘আষাঢ়ের খেয়ালের কোন খেয়া… ‘  সেই ফিকে  সুর টুকু ছাড়া আর একটাও শব্দ নেই কোথাও। পূরবীর সাথে গোটা পাড়াটার-ই যেন মরণ হয়েছে।
হ্যাঁ। পূরবী মারা গেছে। অন্ততঃ সবাই বলছে তাই। গত দিন ছয়েক সে নিখোঁজ, আজ পুলিশ বলেছে  তার শব মিলেছে কোথাও, সনাক্ত করতে হবে। কোথায়, সেটাও বলেছিল তারা, মা শুনতে পায়নি। তিলতিল করে বেড়ে ওঠা আশঙ্কা টা সামনে মূর্তমান হওয়ায় খুঁটিনাটি গুলো অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে, মা এর কাছে। মেয়েটা আর নেই, কি করে, কোথায় সেটা পরের প্রশ্ন, মেয়েটা আর ফিরবে না, এই ব্যাপারটা বোধগম্য হতে খানিক সময় লাগবে মায়ের। সে লাগুক। বাবা কে নিয়ে চিন্তা। বেলা বেলা বেরিয়েছে লোকটা প্রবল বৃষ্টি মাথায় করে, মরা মেয়ের মুখ দেখবে বলে। সারা রাস্তা টুকু কি ভেবেছে সে? ইতিহাস? নাকি লক্ষ কোটি উত্তরহীন প্রশ্নের দিকে তাকিয়ে থেকেছে বোবা হয়ে? নিজেকে দোষী করেনি? কেন গত ছ’দিন মেয়েটা বাড়িছাড়া, কেন আজ একটা মর্গে সে শুয়ে, তা বাবা জানেনা, কিন্তু তাতে নিজের উপর রাগ হতে বাধে নাকি? বাবা তো! কিছু নিশ্চই করার ছিল এই পরিণতি এড়াতে?
ইজিচেয়ার টায় ঠায় হেলান দিয়ে বসে আছে ঠাম্মা। কড়িকাঠের দিকে চোখ। একটা ফোঁটা ঘন্টা দেড়েক আগে গাল বেয়ে পড়েছিল, শুকিয়ে গেছে। অপরাধবোধ? “আমি এখনো বেঁচে আছি, আর নাতনিটা… “survivor’s guilt? ‘ যে মধু হৃদয়ে ছিল মাখা, কাঁটাতে কি ভয়ে দিলি ঢাকা…’ পাশের বাড়ির কাকিমা এসে ভাত আলু ডিম সেদ্ধ ফুটিয়েছে। স্বাভাবিক ভাবেই গত কদিন অনিয়মে চলেছে এ বাড়ি, খাওয়াদাওয়ার দিকে নজর ছিল না। আজকের পঞ্চব্যঞ্জন ও যে ফেলা যাবে, তাতে সন্দেহ নেই, তবু, দায়িত্ব একটা থাকেই। মা এর পাশে আত্মীয়া দের ভিড়। কিছু কান্নাকাটি করার কথা ছিল তাদের, তারা “হায় কি হল গো”র দল। আজ বিশেষ সুযোগ পায়নি। হতাশ।  ভেবে পাচ্ছেনা কি করবে, এখনি মরা মেয়ের অচৈতন্য মায়ের সামনেই  “নির্ঘাত পোয়াতি কেস ” বলাটা তাদের হিসেবেও অশোভন।
পূরবীর বন্ধুরা এখন ক’দিন এ বাড়ির ছায়া মাড়াবেনা। কাকু, কাকিমা সামনে পড়ে গেলেই মাথা নীচু করে পালাবার পথ খুঁজতে হবে। কি বলবেই বা কি তারা? একটা সন্তান হারানো দম্পতি কার কি ই বা বলার থাকতে পারে? আর তাছাড়া  এ’কদিন কম হয়রানি তাদের ও হয়নি। তারা নিজেরা খুঁজেছে তো বটেই, পুলিশ আর কাকু কাকিমার প্রশ্নের জবাব ও দিয়েছে বিস্তর।  দুপুরের দিকে একটা গোঁফ দাড়ি ওলা ছেলে এসেছিল, ছলছলে চোখে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে চলে গেল। ক’দিন আগেও সে ‘প্রাইম সাস্পেক্ট’ ছিল, কিন্তু সে যে এ ব্যাপারে বিন্দু বিসর্গ জানে না, পাঁজরে দুটো লাঠি খেয়েই সেটা প্রমাণ হয়ে গেছে। তাতে সে কিছু মনে করেনি, পূরবী কে খুনের হুমকি সে যথেষ্ট দিয়েছে, কিন্তু সেগুলো নিছক-ই “মেরেই ফেলবো তোকে!”। ছেলেটা বাস্তবিক কষ্ট পেয়েছে। আর কোনদিন এই বাড়ি তে সে আসবে না।
দেবব্রত গেয়েই চলেন রেডিও তে… ‘ বুঝি এলি যার অভিসারে,  মনে মনে দেখা হল তারে ‘  মোড়ের মাথায় আরেকজন বসে আছে ফুটপাথের উপর। চুপচুপে ভিজে। গতকাল শহরে ফিরেছে ছেলেটা, বন্ধু মারফত পূরবীর অদৃশ্য হবার খবর পেয়ে। এসে অবধি গোটা শহর তোলপাড় করেছে। একটা ছবি নিয়ে জনে জনে জিজ্ঞেস করে বেরিয়েছে,”দেখেছ একে “? পূরবীর বাবার উপর মেজাজ হারিয়েছে, বলেছে “সব আপনার দোষ”, তারপর কেঁদে বসে পড়েছে মাটিতে, বলেছে “না! সব দোষ আমার, আমি দায়ী কাকু, আমি… ” যত্ত নাটক। পুলিশ জানতে চেয়েছিল, কি জানো তুমি? সেইবেলা কোনো উত্তর কি সে দিতে পেরেছে? কোথায় গিয়েছিল মেয়েটা? কেন? নিরুদ্দেশ হবার লোভটা কি এই ছেলেটাই ওকে দেখায়নি? তবে কি ছেলেটা ধরে নিয়েছিল, এত গুলো “আমি চলে যাব একদিন দেখিস ” সব কেবল মুখের কথা? সত্যি-ই কি ও ই দায়ী নয়?
হয়ত এসব কিছুই নয়। অনেক সাধারণ কিছু অথবা অনেক বড় কোনো চক্রান্ত। হয়ত স্বেচ্ছায় বাড়ি ছেড়েছিল পূরবী, বা কারুর প্রভাবে বা হয়ত কেউ জোর করেই… যেটাই হোক, মেয়েটা চলে গিয়ে অনেকগুলো লোকের অসুবিধে করে দিয়ে গেছে। সবাই চায় পূরবী ফিরে আসুক। কিন্তু…  একটা সাদা সরকারী গাড়ি গলিতে ঢোকে, সকলকে সচকিত করে। কাঁদতে কাঁদতে পূরবীর বাবা নামে, দরজা অবধি দৌড়ে আসা মা কে আলিঙ্গন করে বলে “না! না! পূরবী নয়, অন্য কেউ !”
 
আজ সাত দিন হল পূরবী বাড়ি ফেরেনি।  অন্য কোথাও , বারাসাতে বা বারুইপুরে কারো বাড়িতে মরাকান্নার রোল ওঠে, কিন্তু এই পাড়াটা এখনো নিঃশব্দ, থমথমে।
“ছায়া ঘনাইছে বনে বনে… ” দেবব্রত বাবু গানটা শেষ করেন…
Advertisements