ওগো বরষা তুমি ঝোরো নাকো অমন জোরে,
কাছে সে আসবে তবে কেমন করে?
এলে না হয় ঝোরো না হয় অঝোর ধারে,
যাতে সে যেতে চেয়ে ও যেতে না পারে…

 

          কিসের একটা প্রবল সম্ভাবনা গোটা আকাশে তৈরি হয়ে আছে! বিকেল চারটে মত বাজে, ঘড়ি দেখতে ইচ্ছে করছে না! ঘরটা অন্ধকার হয়ে আছে, আলো জ্বালাতে ইচ্ছে করছে না! দোতলার বারান্দা থেকে নড়তেই ইচ্ছে করছে না… কেউ একটা কফি করে আনলে বেশ হত। আরামকেদারাটা বারান্দায় টেনে এনে বসলাম। দিব্যি হাওয়া দিচ্ছে একখানা, পাশের বাড়ির ছাদে কাকিমার শাড়িগুলো উড়ছে। আরেকটু কমে গেল না আলো টা? রাস্তার আলোগুলো জ্বলতে শুরু করছে। নীচে রাস্তার ওপাশে তেলেভাজার দোকানে লুঙ্গি পরা দোকানদার কড়াইয়ের তেলে বেসনে ডোবানো চপ গুলো ছাড়তে আরম্ভ করেছে। মেঘ ডাকল। বারান্দাটা অর্থহীন হয়ে গেল।

ছাদের ঘরে এলাম। শব্দের জাদুঘর।  আমি ছাড়া এই ঘরে বড় একটা কেউ আসে না। অন্তত ঠাকুরদা মারা যাবার পর তো আরোই না। দরজা টা খুললাম। ভেজা কাঠের গন্ধ, ফুরিয়ে যাওয়া ধুপকাঠির গন্ধ, ঠাকুরদার গন্ধ জমে রয়েছে ঘর টায়। আর রয়েছে ধুলো। পরম যত্নে আগলে রেখেছে যন্ত্র গুলোকে। আমি তাদের দেখি, ধরি না। আজ ইচ্ছে হল। একটা ন্যাকড়া তুলে নিয়ে পরিষ্কার করতে বসলাম। দেওয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড় করানো তানপুরাটা। হাত বোলালাম। দিব্যি সুরে বাঁধা আছে। বাইরে মেঘটাও এক ই সপ্তকে ডেকে উঠল। আবার। মনটা আনচান করছে। তার বার্তায় যেন না লেখা কিছু একটা আছে, যেটা আমার বোধগম্য হচ্ছে না! বিজুরি চমকে, জিয়ারা তরসে… তানপুরাটা একটা গুঞ্জন তুলল। সে একটা সুর চায়, সেই সুরে কথা চায়, আবছায়া অসম্পূর্ণ অনুভূতিটার একটা মূর্ত রূপ চায়। কথা তো তৈরি হয়েই আছে। আমার মনে। মেঘ এ ভাসছে সুর।  কনুই টা অসাবধানে ঠেকে গেল সরোদ টায়। ঝংকার দিয়ে বেজে উঠল। আমি চমকে সরে গিয়ে আঘাত হানলাম সেতার টায়। তার রেশ ঘুরতে লাগল বদ্ধ ঘর টায়। জানালা টা খুলে দিলাম। ভয়ঙ্কর কালো করেছে আকাশ টা! কারে কারে, অত হি ডরায়ে… দেওয়ালে ঝোলান কাপড়ের ব্যাগ টা ঠেকে সবচেয়ে বড় বাঁশি টা বের করলাম। ঠাকুরদা থাকা কালীন এটা আমার পক্ষে বড্ড বড় হত। আজ দেখলাম আঙুলে বেশ নাগাল পাওয়া যাচ্ছে! একটা ফুঁ দিলাম। ঘর টা গমগম করে উঠল। পাল্টা জবাব দিল মেঘটা! আমার আঙুল গুলো তে কেউ একটা ভর করেছিল, মল্লার আমি আগে বাজাইনি, বাজাতে শিখিনি, তার আগেই ঠাকুরদা ইহলোকের পাট চুকিয়েছেন। তাই বোধহয় এই রাগ টার উপর আমার এত টান। মন্দ সপ্তকের পা থেকে এক লাফে মধ্য সপ্তকের গা ছুঁয়ে নেমে এলাম ফের। কী বাজাচ্ছিলাম জানিনা, বড় চেনা চেনা লাগছিল। ক্ষণিক পরেই পরিষ্কার হল!
নি পা গা রে মা মা পা…
কানন পর ছায়া বুলায়, ঘনায় ঘনঘটা,
গঙ্গা যেন হেসে দুলায় ধূর্জটির জটা!
যেথা যে রয়, ছাড়িল পথ,
ছুটালে ওই বিজয় রথ,
আঁখি তোমার তড়িৎ-বৎ, ঘন ঘুমের মোহে…
এসেছ প্রেম, এসেছ আজ, কি মহা সমারোহে…

সময়ের খেয়াল ছিল না। বৃষ্টির ছাঁটে হুঁশ ফিরল। জানালা বন্ধ করে তড়িঘড়ি নীচে নেমে এলাম। পাশের বাড়িতে রেডিও তে গজল শুনছে ওরা… ঘরের সব জানালা বন্ধ করতে করতে কিছু পঙক্তি কানে এলো…

সাওয়ান, তু বরস, লেকিন ইতনা নেহি কি ও আ না সাকে,
একবার যো ও আ যায়ে ফির তু বরস, জমকে বরস,   ইতনা বরস, কে ও যা না সাকে…


আবার মেঘ ডাকল। সাথে সাথে ধাঁধা টা ধরে ফেললাম! ” মেঘ ডাকছে!” মেঘ আমায় ডেকেছে! সরাসরি নয়, ইঙ্গিতে! আজ আমি যাব মেঘের বাড়ি!

Advertisements