দরজা টা খুলে গেল, পর্দা টা উড়িয়ে ঘরে ঢুকল সে। আমায় যেন দেখতেই পায়নি, কোন একটা গান গুনগুণ করছে… কব্জির ঘড়ি টা খুলে কাঠের দেরাজে ঢুকিয়ে রাখল। পায়ের চটি দুটো হাওয়ায় ভেসে একটা খাটের তলায়, আরেকটা কোথায় জানি আশ্রয় নিয়েছে। বাতাসে ভর করে হেঁটে আয়নাটার সামনে এসে দাঁড়াল। আমি এখন ওকে ছুঁতে পারি, অথচ ও দেখছেই না আমায়।  ও নিজেকে দেখছে। অবশ্য সেটাই স্বাভাবিক, ইলোরার ভাস্কর্য ও, আমি দেওয়ালের গত ভোটে আঁকা কার্টুন। জানালার পর্দা টা একটু সরে গেল, শেষ বিকেলের গলা সোনার রঙ এসে গলিয়ে দিল ওকে। আমি আরো অন্ধকারে সরে গেলাম।
 
বাঁ দিকে মাথা ঝুঁকিয়ে বাম কানের দুল টা খুলে নিলো, তারপর ডানদিকের টা… একটু মুচকি হাসল কি? কি ভাবছে? হাত দুটোকে মাথার পিছনে নিয়ে গেল আড়মোড়া ভাঙার ভঙ্গিতে। আঙুল দুটো একটু হাতড়ে গলার হারটা… এই ভয়ঙ্কর বস্তুটা আজ অনেকের সর্বনাশ করেছে। নীচের ঘরে এতক্ষণ মোচ্ছব চলছিল। চলছে, এখনো, আমি খানিক্ষণ আগে শব্দে বিরক্ত আর অদৃশ্য হবার অভিমানে চলে এসেছি উপরে। কটা কালো সুতোয় নিজেকে জড়িয়ে ঝাঁপ দিয়েছে একটা উজ্জ্বল নীলা। ওর বুকের প্রশস্ত উপত্যকাও কম পড়েছে, নীলাটা খুব বিপজ্জনক ভাবে দুই পর্বতের শুরুর মুখটা ছুঁয়ে আছে। আধো মাতাল আর অসহ্য আপদ গুলোর দৃষ্টি চুম্বকের মত টেনেছে নীলাটা, আর অবধারিত ভাবে সেখানেই থেমে থাকে নি। ওর ময়ূরকণ্ঠী আঁচলে লুকোনো ঐশ্বর্য সাত-লাখি নীলা কে ম্লান করে দিয়েছে। সেই নীলার হারটা খুলে চলে এল ওর হাতে, খুব তাচ্ছিল্য ভরে সেটা আয়নার সামনের আর পাঁচটা দ্রব্যের ভিড়ে মুখ লুকোলো। হাঁফ ছেড়ে বাঁচল বোধহয়। 
 
কুট কুট করে বাঁ হাতের তর্জনীর নখটা খাচ্ছে ও। আর হাসছে! ও হাসছে কেন? আর আমায় কি ও সত্যি দেখতে পাচ্ছে না? তাহলে যে দু চোখ ধাঁধিয়ে দেওয়া আঁচল টা এত দৃঢ়তার সাথে এত গুলো নজরের আঘাত সামলেছে, এই মৃদু দুলুনি তে সেটা খসে পড়ল কি করে? আয়নার সামনে ময়ূরকণ্ঠী মেয়ে নখ খাচ্ছে। থুতনি টা বুকে ঠেকিয়ে ঠোঁট ফুলিয়ে পায়ের পাতার দিকে তাকিয়ে এখন, আভরণ পছন্দ নয়? বেশ যত্ন করে শাড়ির কুঁচিটা কোমরবন্ধনী থেকে তুলে নিলো, পা এর কাছে লুটোপুটি খাচ্ছে ব্যাবিলনের রেশম। দ্বিধাহীন হাত অবলীলায় সরিয়ে দিল বক্ষবাসটাও। আমার সামনে দাঁড়িয়ে পারিজাতপুরের রাজকন্যা, কেবল অন্তর্বাসে। গোটা ঘরে সহস্র আয়না এখন, কনে দেখা আলোটা ফিকে হয়ে আসছে ওর তেজে। আমি বিলীন হয়ে যাচ্ছি। 
এমন সময় অন্ধকারে পদার্পণ করল আলোর দেবী। আমার খুব কাছে সরে এলো। দুটো হাত আমার দু কাঁধে মেলে দিলো, গোড়ালি উঁচু করে মুখ টা আমার কানে ছুঁইয়ে বলল…
” খুলে দে… “
আমার ভীত, সন্ত্রস্ত, আপ্লুত, দিশাহীন আঙুল কিছু হাতড়ে হুক টা খুলল শেষ অব্ধি। আগ্নেয়গিরি জেগে উঠল? আমার আর কোন নিজস্ব অস্তিত্ব নেই এখন, ক্রীতদাস আমি দেবীর ইচ্ছেয়। লুটিয়ে পড়লাম তার পায়ের কাছে, তার কটিবাসের মতন-ই।
দেবী আফ্রোদিতি দেখা দিলেন, দেখলেন আমায়। তার পরণে এক রহস্যময় হাসি আর একটা লাল টিপ।
Advertisements