এই শহর জানে আমার প্রথম সব কিছু…
পালাতে যাই যত, সে আসে আমার পিছুপিছু…ধর আমরা আর কোলকাতায় থাকিনা। তুই এমনিতেই থাকিস না, থাকিস কিন্তু চিনিস না , কিন্তু মাঝে মধ্যে আসিস বলে তর্কের খাতিরে ধরে নেওয়া গেল তুই কলকাতার ই মেয়ে। তোকে নিয়েই না হয় এই মজার খেলাটা খেলা যাবে, কিন্তু বড্ড বিচ্ছিরি তুই, বায়না করলেই মাথায় চাঁটি, মনে থাকে যেন!

যাই হোক, এসে পৌছুলাম হাওড়া স্টেশনে, তখন ভোরের আলো আলস্যে হাই তুলছে। ভোরের আজান তাকে alarm বাজিয়ে ডেকে তুলল। ততক্ষণে আমরা হাওড়া ব্রিজের উপর চলে এসেছি। ডান দিকে তাকিয়ে দেখ, কুয়াশা পেরিয়ে আবছা দেখা যাচ্ছে দ্বিতীয় হুগলী সেতুর চূড়া। গন্ধ টা পাচ্ছিস? ঘরে ফেরার গন্ধ? চল, আজ সারাদিন কোলকাতা ঘুরব আমরা!

কোনদিন এই ব্রিজ টা হেঁটে পেরিয়েছিস ? এই সেতু টা কেবল গঙ্গার এপার ওপার নয়, আরও অনেক কিছু জুড়ে দ্যায়। চিঠির প্রেরকের সাথে প্রেরিত কে জুড়ে দেয়, ঘরছাড়া পথিক কে জোড়ে বাড়ির সাথে। পৃথিবী কে জোড়ে কলকাতার সাথে। নিচে তাকিয়ে দেখ, সূর্য প্রণাম করছেন কত লোক, ফুলবাজারের ঘাটে ধুতি আর নামাবলি জড়িয়ে একটু পুণ্যের সন্ধানে আসা। রাস্তায় এখন কত কম  লোক দেখেছিস? পাগড়ি পড়া শিখ খুড়ো তার ট্যাক্সি ধুচ্ছে। পোস্তার দিকে সারিসারি ট্রাক দাঁড়িয়ে শেষ বেলার ঘুম টুকু পুরিয়ে নিচ্ছে। কোথা থেকে শুরু করা যায় বলতো? ওই দ্যাখ শ্যামবাজারের বাস, চ!

কলকাতায়  ভৈরবী বাজে দক্ষিণেশ্বরে। ঘাটের উপর চুপটি করে বসে থাকলে সেটা শুনতেও পাবি। ভোরবেলায় অমন শান্ত স্নিগ্ধ, serene যায়গা আর দুটো পাবিনা। আড়মোড়া ভেঙে দুটো গরম জিলিপি খেয়ে নিসখন। শ্যামবাজারের মোড়ে এসে চাড্ডি কথা কয়ে নিস নেতাজির ঘোড়াটার সাথে। তার পর ট্রাম ধরে চল যাই ডালহৌসি। জেগে উঠতে দেখতে পাবি শহর টাকে। দোকান গুলো খুলবে, আস্তে  আস্তে সংখ্যা বাড়বে গাড়ির, মানুষের। আমাদের কন্ডাক্টর ভদ্রলোক টিকিট চাইতে এলে তার বাড়ির খোজ নিস, কেউ নেয় না। তারপর জানালার বাইরে তাকাস, কলেজ স্ট্রিটের ধাঁধা, আর রবীন্দ্র সরণীর বিপুলতা দেখতে পাবি, দেখবি প্রাচীন সেই বাড়ি গুলোকে! তারপর হঠাত নজরে আসবে সাহেব পাড়া! ট্রামগুমটি টাও প্রাচীন নয় কি?

এইবার দেখবি ব্যস্ততা! দেখবি আর গুনবি, আর হাল ছেড়ে দিয়ে ভেসে যাবি! দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, গন্ধ, বর্ণ  নির্বিশেষে মানুষ পাবি এখানে, উকিল থেকে জমাদার! আর একটু বেলা গড়িয়ে গেলে যাব লাল্ বাজারের দিকে, ঘুরে দেখবো বাজনার দোকান গুলো। চা আর কচুরি দিয়ে দিব্যি breakfast হবে, বল!

কলকাতার দুপুর ভবানিপুরের! পাইস ভাতের দোকানে মাছের ঝোল ভাত, পুরো বেহাগের তান! তারপর মেট্রো চড়ে সোজা ময়দান! গাছের ছায়ায় খানিক বিশ্রাম। রোদ টা একটু পড়ে এলেই হাঁটা লাগাব পার্ক স্ট্রিটের দিকে। এশিয়াটিক সোসাইটি পেরিয়ে একটু হেঁটেই যে স্বর্গ- অলি পাব! বিকেল চলল পুরবীর গৎ-এ, রঙিন মায়ায় সন্ধ্যে ঘনায়! মাতাল দুটো দূত চলল টলমল পায়ে! একটা ট্যাক্সি নিয়ে এবার প্রিন্সেপ ঘাট! বা দিক ঘেঁষে ডুববে সূর্য, দ্রুত লয়ে চক্র রেল ছুটবে প্রেক্ষাপটে… গঙ্গার হাওয়ায় হয়ত ঘুম পাবে একটু, কিন্তু ঘুমোস্ নি যেন, আমরা ভিক্টোরিয়া যাব যে, রাতের আলোয় মোহময় সেই শ্বেত পরীর রাজপ্রাসাদ!

পুরবীটা বাঁক নেবে হংসধ্বনিতে, আমরা নন্দন কে পাস কাটিয়ে আজ যাব রবীন্দ্র সদনে নাটক দেখতে! ডিনার কোথায় করবি? কাছেই  এলগিন রোড এর কাছে একটা দারুন রেস্তোরা চিনি! (নাম টা ভুলে গেছি, বাবার থেকে জেনে নেব!) যাইহোক, বাড়ি পৌঁছে দেব খন তারপর। একটা চুমু ও খাব কিন্তু, আপত্তি করলে চাঁটি!

Advertisements